রাতে তাড়াতাড়ি না ঘুমালে যৌনসমস্যাসহ হতে পারে অন্যান্য ক্ষতি(Sleep 2024)

 বাল্যকাল থেকেই সঠিক সময়ে ঘুমানোর গুরুত্ব সম্পর্কে আমরা শুনে আসছি। যে "Early to bed, early to rise makes a man healthy, wealthy and wise". তবে সঠিক সময়ে ঘুমানো অর্থাৎ দ্রুত ঘুমিয়ে যাওয়া এবং ভোর ভোর ওঠা ঠিক কি কারণে গুরুত্বপূর্ণ, এর বৈজ্ঞানিক কারণ হয়তো জানা নেই আপনার। 

এবং দীর্ঘদিন যাবৎ যদি কেউ অতিরিক্ত রাত জেগে থাকে, এবং এই অভ্যাসেই অভ্যস্ত হয়ে যায় তাহলে দীর্ঘসময় ঐ ব্যক্তিকে পস্তাতে হবে। কেননা, sleep cycle শরীরের হরমোনের ভারসাম্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দিনের নির্দিষ্ট কিছু সময়ে কিছু হরমোনের পরিমাণ বেড়ে যায়, আবার কিছুর পরিমাণ কমে যায়। ঐ অনুযায়ী ঘুমালে স্বাস্থ্যের পক্ষ ভালো। অপরদিকে এর ব্যতয় ঘটলে হতে পারে ভয়াবহ ক্ষতি। 


সঠিক সময়ে ঘুম কেন জরুরি(Why sleep cycle is important) 

আমাদের শরীরে ঘুম নিয়ন্ত্রণ করে যে হরমোন তার নাম মেলাটোনিন। মেলাটোনিনের পরিমাণ আমাদের দেহে সর্বোচ্চ হয় রাত ৯ টা, সাড়ে ৯টার দিকে এবং রাত ২টার পর মেলাটোনিন এর পরিমাণ কমতে থাকে। তাই ঘুমানোর আর্দশ সময় হচ্ছে রাত ৯-৯:৩০ এর মধ্যে। কেননা ঐ সময় মেলাটোনিনের পরিমাণ সর্বোচ্চ থাকার ঐ সময় ঘুমালে কারো পক্ষে deep sleep বা গভীর ঘুম অর্জন করা সম্ভব হয়।


গভীর ঘুম দেহ পুর্নগঠন এবং নিজের কাজের দক্ষতা বাড়ানো বা cognition বাড়াতেও সাহায্য করে। বিভিন্ন motivational speaker রা প্রায়ইস delta sleep এর কথা বলে থাকে। delta sleep বলতে deep sleep বুঝায়, গভীর ঘুমে থাকলে পরবর্তীতে ঘুম থেকে ওঠলে শরীর চাঙ্গা হতে পারে সহজে।


 নতুবা ঘুমানোর পরও মনে হবে শরীর দুর্বল বা tired। অনেক সময় ৮-১০ ঘন্টা ঘুমের পরও মনে হবে শরীর ম্যাচম্যাচ করছে বা শরীর ঝিমাচ্ছে। মনে হবে, আরো ২-৩ ঘন্টা ঘুমাই। এর কারণ মূলত অসময়ে ঘুম যখন মেলাটোনিন এর পরিমাণ ছিলো কম। 

ঐ ঘুমে সারা দিনে শরীরের যে ক্ষয় তা পূরণ হয়নি। তাই সঠিক সময়ে ঘুম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দেহের পুর্নগঠনের জন্য। দেহের যে শক্তি বা energy দরকার সেটা পায় ATP থেকে। ঘুমের সময় মাইটোকন্ড্রিয়ার মাধ্যমে এই ATP তৈরিতে সহায়তা করে এই মেলাটোনিন হরমোন। 


মেলাটোনিনের অপর একটি কাজ দেহকে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স(Insulin Resistance) করে দেয় যাতে খাবারের মেলাবলিজম(metabolism) বা বিপাক কম হয়। ঘুমের সময় শরীর বিশ্রামে থাকে, তাই শরীরের বিপাকীয় কার্যাবলি কমিয়ে দেয়া স্বাভাবিক। এখন যদি অসময়ে ঘুমানো হয় তাহলে এই বিপাকীয় ভারসাম্য হারাবে(metabolic disturbance) । মেলাটোনিনের পরিমাণ অসময়ে বেশি হবে যা ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স করে ডায়াবেটিস এর সম্ভাবনাও বাড়িয়ে দেয়।


সঠিক এবং ভালো ঘুমের সাথে সেক্স হরমোন(sex hormone) এর পরিমাণ বাড়া অথবা তৈরি হওয়ার সাথে সম্পর্কিত। deep sleep এর ২ ঘন্টার সময় সেক্স হরমোনের উৎপাদন শরীরে বেড়ে যায়। ছেলেদের ক্ষেত্রে টেস্টোস্টেরন এবং মেয়েদের ক্ষেত্রে ইস্ট্রোজেন নামক দুটি গুরুত্বপূর্ণ সেক্স হরমোন স্বাভাবিক যৌনাঙ্গ বৃদ্ধি(gonads and sex organs development) এবং যৌনবহি:প্রকাশের(sexual characteristics) জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। 


তাই এসব হরমোনের পরিমাণ কমে গেলে যৌনশক্তিও ক্রমাগতও হ্রাস পেতে থাকে। অন্যদিকে টেস্টোস্টেরন(testosterone) শুধুমাত্র স্পার্ম বা বীর্য উৎপাদনের সাথে জড়িত নয় বরং ছেলেদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি এবং দেহের স্বাভাবিক ফাংশনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। টেস্টোস্টেরন রক্ত কণিকাও বৃদ্ধি করে। 

ভোর ৪টা এবং ৬ টার সময় এই হরমোনের পরিমাণ সর্বোচ্চ বাড়ে। তাই সঠিক সময়ে ঘুম জরুরি। 

আবার মেয়েদের ইস্ট্রোজেন নরমাল পিরিয়ড বা menstrual cycle এর জন্য দরকার হয়। ইস্ট্রোজেন না থাকলে পিরিয়ড অস্বাভাবিক হবে এমনকি বন্ধও হয়ে যেতে পারে। অতএব সঠিক সময়ে না ঘুমালে বন্ধ্যাতেরও সম্ভাবনা বেড়ে যায়(effects reproductive life)


cortisol যা একটি stress hormone, দেহে গ্লুকোজের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। সকাল ৮টার দিক এই হরমোন সর্বোচ্চ থাকে এবং তখন ঘুম থেকে ওঠলে cortisol বেড়ে গিয়ে গ্লুকোজ সর্বোচ্চ হয় এবং আমরাও কাজ করার energy পাই, ফলে দিন শুরু হয় এনার্জি বা সবল থেকে। অসময়ে ঘুম এটা দিবে না।


ভালো ঘুম হার্টের রোগ কমায়, হাই ব্লাড প্রেসার বা hypertension কমায়। 

আপনার রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা(immunity) বাড়াতেও সঠিক ঘুম জরুরি। 

ঘুম স্ট্রেস কমায়, inflammation বা প্রদাহ কমায় এবং দীর্ঘায়ু করে। 

অতএব রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমানোর উপকারিতা ব্যাপক।

রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমানোর উপকারিতা,কোন কোন সময়ে ঘুমানো উচিত নয়,ঘুমানোর সঠিক সময়,সঠিক সময়ে না ঘুমালে যেসব সমস্যা হয়,sleep cycle এর গুরুত্ব,রাতে দেরি করে ঘুমালে যেসব ক্ষতি হয়, রাত জাগার কি কোনো অপকারিতা আছে,
sleep cycle মেনে চলার গুরুত্ব অপরিসীম। এজন্য রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমাতে হবে। ঘুমানোর আদর্শ সময় হচ্ছে ৯-৯.৩০ যখন মেলাটোনিন থাকে সর্বোচ্চ।
Health tips by health science 


ঘুমানোর সঠিক সময় কখন?(Proper time for sleep)

ঘুমানোর সঠিক সময় ৯ থেকে ৯.৩০ এর মধ্যে। তবে বর্তমান যুগে রাত জাগাটা যে হারে সাধারণ একটা ব্যাপার হয়ে যাচ্ছে সেক্ষেত্রে যদি পারা যায় সর্বোচ্চ ১১টা পর্যন্ত জাগা। যাদের ৯টা বা ১০টা সম্ভব না তারা চেষ্টা করবেন ১১টায় ঘুমাতে। 

এক্ষেত্রে উল্লেখ্য ৯-৯.৩০ হচ্ছে উত্তম সময়, তবে ১০টা বা ১১ টা বাজে ঘুমাতে পারলেও ভালো।

এটা ব্যতীত অধিক রাতে ঘুমানো উচিত নয়। আবার আমরা ৩টা থেকে ৭-৮টা পর্যন্ত active কাজ করতে পারি। ওসময়ে না ঘুমানোর চেষ্টা করা উচিত। 


ঘুম থেকে ওঠার সঠিক সময় কোনটি?(proper time for getting up from sleep?)

ঘুম থেকে ওঠার সবচেয়ে সঠিক(most perfect) সময় হচ্ছে ৪-৫টার মধ্যে। তবে ৮টার আগে ওঠতে পারলে ভালো। একটি গবেষণায় পাওয়া গেছে, যারা ৮টার আগে ওঠতে পারে না তাদের ডায়াবেটিস এবং হার্ট ডিজিজ হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।


এখন সঠিক সময়ে না ঘুমালে কি ক্ষতি হবে বা রাতে বেশি জাগলে কি হয়?(What will happen when you don't sleep properly?) 

দ্রুত ঘুমানো এবং দ্রুত ওঠার গুরুত্ব থেকেই বুঝা যায় যে ভালো ঘুম স্বাস্থ্যের জন্য কতটা জরুরি। 

সঠিক সময়ে না ঘুম আসলে বা রাতে তাড়াতাড়ি না ঘুমালে cognitive ability কমবে। মানুষের দক্ষতা, critical thinking, reasoning সবই হ্রাস পাবে। অর্থাৎ কোনো কাজ করায় মনোযোগ হারাবে অথবা কাজ করার ইচ্ছা চলে যাবে। 

রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমানোর উপকারিতা,কোন কোন সময়ে ঘুমানো উচিত নয়,ঘুমানোর সঠিক সময়,সঠিক সময়ে না ঘুমালে যেসব সমস্যা হয়,sleep cycle এর গুরুত্ব


১৯৭১ সালের পর থেকে এখন ২০২৪ সাল অবধি পুরুষ বা ছেলেদের স্পার্ম কাউন্ট কমেছে প্রায় ৫১%। এর কারণ হচ্ছে স্লিপ সাইকেল নষ্ট হওয়া। বর্তমানে রাত জাগাকে আমরা উৎযাপন করি বা রাত জেগে পড়া, কঠিন পরিশ্রম করা বা কাজ করাকে আমরা বাহবা দেই। কিন্তু এতে যে যৌন পরিশক্তি দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে তার সম্পর্কে আমরা অবগত নই। 

মেয়েদের ক্ষেত্রেও ঘুম সঠিক সময়ে না আসলে মেজাজ খিটখিটে হয়, কাজে মন আসে না এবং পরিয়ড নিয়মিত হয় না বা এর প্যাটার্ন বা cycle নষ্ট হয়। 

পরিমিত ঘুম না আসলে ওজন বেড়ে যায়। 

মানুষের খাবার প্রবণতা বেড়ে গিয়ে মূলত মানুষ ফ্যাট জমায়। 

আমাদের নরমাল শারীরতত্ত্বীয় বা physiological বিষয়ের বিরুদ্ধে গিয়ে কোনো কিছু করাই শরীরের জন্য হিতকর নয়। এর ফল দীর্ঘসময় ধরে ভোগ করতে হবে। 

ডায়াবেটিস, হার্ট ডিজিজ এমনকি আয়ুও কমে যাবে দীর্ঘসময় যাবৎ ঘুমের নিয়ম না মেনে চললে।


যারা ইতোমধ্যে রাত জাগার অভ্যাস হয়ে গেছে তাদের করণীয় কি?

এক্ষেত্রে সর্বপ্রথম করণীয় হচ্ছে নিজেকে বুঝানো কেন তাড়াতাড়ি রাতে ঘুমাতে হবে। দীর্ঘকালীন রাত জেগে থাকলে যেসব ক্ষতি হয় সেসব কথা চিন্তা করে নিজের মনোবল দৃঢ় রাখতে হবে। 
এটা করলে সহজ হবে তাড়াতাড়ি ঘুমানো। এরপর তাড়াতাড়ি ঘুমাতে যেসব বাধা বিপত্তি আছে ওগুলো দূর করতে হবে। 
পরিবেশ এমন করতে হবে যাতে রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমানো যায়। নিজের প্রতিদিনের কাজ রাতের জন্য রেখে না দেওয়া, বরং দ্রুত করে ফেলা।
ঘুমানোর রাতে ফোন ব্যবহার করা যাবে না, কেননা ফোন ব্যবহার করলে ব্রেনের তাপমাত্রা কিছুটা বেড়ে যায়। অথচ ঘুমানোর জন্য ব্রেনের তাপমাত্রা কমপক্ষে ১ ডিগ্রি কমানো উচিত।


প্রতিদিন চেষ্টা করা আগের দিনের তুলনায় ৫ মিনিট আগে ঘুমানো। এতে আস্তে আস্তে সময় কমে আসবে। যদিও এটা ১০-১২ দিনে হবে না। নিয়মিত চেষ্টা করতে করলে ২-৩ মাসের মধ্যে আপনি অন্তত ২ ঘন্টা আপনার ঘুমের সময় এগিয়ে নিয়ে আসতে পারেন। 

এবং হ্যা, হতাশ হওয়া যাবে না। চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।



Post a Comment

0 Comments